৯ম শ্রেণির চারু ও কারুকলা ১৪শ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্টের সমাধান ২০২১

উত্তর শুরুঃ

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষঃ

১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমানে বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারত) বাংলা প্রদেশে দুর্ভিক্ষ। আনুমানিক ২.১-৩ মিলিয়ন বা ২১ থেকে ৩০ লাখ, ৬০.৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে, অপুষ্টি, জনসংখ্যা স্থানচ্যুতি, অস্বাস্থ্যকর অবস্থা এবং স্বাস্থ্য সেবার অভাবের কারণে অনাহার, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগে মারা গেছে। লক্ষ লক্ষ লোক দরিদ্র হয়েছিল কারণ এই সংকট অর্থনীতির বড় অংশকে অভিভূত করেছিল এবং সামাজিক কাঠামোকে বিপর্যয়করভাবে ব্যাহত করেছিল।

অবশেষে, পরিবারগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; পুরুষরা তাদের ছোট খামার বিক্রি করে এবং কাজ খুঁজতে বা ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, এবং মহিলা ও শিশুরা গৃহহীন অভিবাসী হয়ে ওঠে, প্রায়শই সংগঠিত ত্রাণের সন্ধানে কলকাতা বা অন্যান্য বড় শহরে ভ্রমণ করে। ইতিহাসবিদরা সাধারণত দুর্ভিক্ষকে নৃতাত্ত্বিক (মানবসৃষ্ট) হিসেবে চিহ্নিত করেন, জোর দিয়ে বলেন যে যুদ্ধকালীন ঔপনিবেশিক নীতিগুলি তৈরি করেছিল এবং তারপরে সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। কিন্তু, সংখ্যালঘু দৃষ্টিভঙ্গি বলে যে দুর্ভিক্ষ প্রাকৃতিক কারণে হয়েছিল।

১৩৫০ বঙ্গাব্দে (খ্রি. ১৯৪৩) এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে একে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলা হয়। বিশেষ করে দুই বাংলায় দুর্ভিক্ষের করাল থাবা ছিল সবচেয়ে করুণ। এই করুণ পরিণতির জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে একটি নতুন বইয়ে। চার্চিলস সিক্রেট ওয়ার শীর্ষক বইটি লিখেছেন ভারতীয় লেখিকা মধুশ্রী মুখার্জি। বইটিতে লেখিকা এই দুর্ভিক্ষকে মানবসৃষ্ট বলে নিন্দা করেছেন। চার্চিলের বিরুদ্ধে বইটিতে তিনি অভিযোগ তোলেন, এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির পেছনে বর্ণবৈষম্যও তাকে কিছুটা উসকে দিয়েছে।

জাপান প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা) দখল করে নেওয়ার পর তেতাল্লিশের মন্বন্তর শুরু হয়। ওই সময় বার্মা ছিল চাল আমদানির বড় উৎস। এই মন্বন্তরে বাংলাজুড়ে প্রায় ৩০ লক্ষ লোক না খেয়ে মারা যান। ভারতবর্ষের তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনা ও যুদ্ধে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ করায় এই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

মজুদ করার কারণে হু হু করে বেড়ে যায় চালের দাম। একই সঙ্গে বাজারে তা দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। জাপান ভারত দখল করলে খাদ্য যাতে শত্রুর হাতে না পৌঁছায়, এ জন্য ব্রিটিশ সরকার আগাম কিছু ব্যবস্থা নেয়। বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নৌকা ও গরুর গাড়ি হয় বাজেয়াপ্ত—নয় তো ধ্বংস করে ফেলে তারা। এতে চাল বা খাদ্য বিতরণ-ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে।

বাঙালির প্রধান খাবার চালের আকাল দেখা দেওয়ায় ভাতের জন্য সারা বাংলায় হাহাকার পড়ে যায়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষ। পথে-প্রান্তরে লুটিয়ে পড়তে থাকেন না খাওয়া মানুষ। এখানে-ওখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় হাড্ডিসার লাশ। এ সময় জরুরি খাদ্য সরবরাহের জন্য চার্চিলের কাছে আবেদন করেও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে তখন বুভুক্ষু হাজার হাজার মানুষ একমুঠো অন্নের আশায় স্রোতের মতো ধাই করেছেন কলকাতার দিকে। দেখা গেছে, এসব অভাগা দলে দলে পথের ওপর পড়ে ধুঁকছেন আর আবর্জনার পাশে উচ্ছিষ্টে ভাগ বসাতে পরস্পর লড়ছেন। একই সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং তাদের তোষামুদে অবস্থাপন্ন ভারতীয় লোকজন বাড়িতে বসে ভূরিভোজ করছেন।

মধুশ্রী মুখার্জির মতে, ব্রিটিশরাজের শাসনামলের এই অন্ধকারতম অধ্যায়টি এত দিন ছিল আড়ালে পড়ে। তিনি তা আলোতে নিয়ে এসেছেন। মধুশ্রী তার বইয়ে এমন সব তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরেছেন, এতে ওই দুর্ভিক্ষের দায়ভার সরাসরি চার্চিলের ওপর চেপেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মন্ত্রিসভার যেসব বৈঠক হয়েছে, এসব বৈঠকের বিশ্লেষণ রয়েছে বইয়ে। রয়েছে মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন নথিপত্রের তথ্য। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধুশ্রীর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার তথ্য। এসব তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায়, চালে ঠাসা ব্রিটিশ জাহাজগুলো অস্ট্রেলিয়া থেকে এসে ভারতের পাশ দিয়ে চলে গেছে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার দিকে। ওই এলাকায় খাদ্যশস্যের বিশাল মজুদ গড়ে তোলা হয়।

এক সাক্ষাৎকারে মধুশ্রী মুখার্জি সাংবাদিকদের বলেন, চার্চিল যে ত্রাণ-সহায়তাদানে অক্ষম ছিলেন, এ প্রশ্নই ওঠে না। তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা বারবার এ ধরনের উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়েছেন।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবিগুলাে বিখ্যাত হওয়ার কারণ

“প্রত্যেককে কঙ্কালের মতো দেখাতো, মনে হতো শরীরের কাঠামোর ওপরে শুধু চামড়া লাগানো,” বলেন প্রখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দুর্ভিক্ষের সময় তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর।

“ভাত রান্নার সময় যে মাড় তৈরি হয়, লোকজন সেটার জন্য কান্নাকাটি করতো। কারণ তারা জানতো যে তাদেরকে তখন ভাত দেওয়ার মতো কেউ ছিলো না। একবার যে এই কান্না শুনেছে সে তার জীবনে কখনো এই কান্নার কথা ভুলতে পারবে না। এখনো সেসব নিয়ে কথা বলতে গেলে আমার চোখে জল চলে আসে। আমি আমার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।”

বেঙ্গলে এই দুর্ভিক্ষের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪২ সালের এক ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে। তবে এই পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছিল স্যার উইনস্টন চার্চিল ও তার মন্ত্রিসভার নীতিমালার কারণে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইতিহাসবিদ ইয়াসমিন খান বলেছেন বার্মা থেকে জাপানিরা বেঙ্গল দখল করতে চলে আসতে পারে এই আশঙ্কায় ওই নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো।

এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল শস্যসহ সবকিছু ধ্বংস করে ফেলা, এমনকি যেসব নৌকায় শস্য বহন করা হবে সেগুলোও। ফলে জাপানিরা যখন আসবে তারা আর সেখানে টিকে থাকার জন্য সম্পদ পাবে না। এই নীতি গ্রহণের ফলে যেসব প্রভাব পড়েছিল ইতিহাসে সেগুলো ভালো করেই লেখা আছে।”

ভারতীয় প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ সৈন্যদের লেখা ডায়েরিতে দেখা যায়, উইনস্টন চার্চিলের সরকার ভারতে জরুরি খাদ্য সাহায্য পাঠানোর আবেদন কয়েক মাস ধরে বাতিল করে দিয়েছিল। এর পেছনে কারণ ছিল ব্রিটেনে খাদ্যের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং যুদ্ধের বাইরে অন্য কাজে জাহাজ মোতায়েন করা। চার্চিল ভেবেছিলেন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় স্থানীয় রাজনীতিকরাই অনেক কিছু করতে পারবেন। বিভিন্ন নোটে ভারতের প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারেও কিছু ধারণা পাওয়া যায়।

১৯৪৩ সালে আমাদের দেশে যখন মন্বন্তর এল তখন জয়নুল আবেদিন উনত্রিশ বছরের এক প্রাণবন্ত শিল্পী। ইতিমধ্যেই তাঁর কাজের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তথাকথিত শিল্পপ্রেমী নন যাঁরা, তাঁরাও তখন জয়নুলের কাজের সঙ্গে সুপরিচিত। মানুষ ও প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করে জয়নুল তাঁর কাজকে ছাত্রজীবন থেকেই জনমুখী করে তুলেছিলেন। ক্রমশই তিনি খুঁজে নিচ্ছিলেন নিজস্ব আঙ্গিক, যে আঙ্গিক বিদ্যুতের ফলার মতো ঝলসে উঠছিল তেতাল্লিশের মন্বন্তর পর্বে একগুচ্ছ মর্মস্পর্শী ছবির মধ্যে দিয়ে।

পরাধীন ভারত তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুর্বিপাকে পড়ে একেবারে মুমুর্ষু অবস্থায়। চল্লিশের দশকের প্রথমে, ব্রিটিশ সরকার ও তার সঙ্গী এদেশেরই কিছু সুযোগসন্ধানী স্বার্থপর মানুষের চক্রান্তে বাংলার কয়েক কোটি মানুষ অনাহার ও অর্ধাহারের কবলে পড়ে। দেশজুড়ে দেখা যায় চরম খাদ্যসংকট। নিরন্ন মানুষের শবদেহে ভরে ওঠে গ্রাম–শহরের রাস্তাঘাট। এইসময় জয়নুল আবেদিন থাকতেন কলকাতার ১৪ নম্বর সাকসি রোডের একটি বাড়িতে। তাঁর তখন কাজ ছিল সারাদিন ধরে কলকাতার পথে ঘুরে ঘুরে খাদ্যহীন–বস্ত্রহীন মানুষের দুর্দশার ছবি এঁকে বেড়ানো। এইভাবে শতশত স্কেচ করেছিলেন তিনি।

তার মধ্যে নির্বাচিত বারোটি স্কেচ নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন অবিস্মরণীয় একটি অ্যালবাম, যার নাম ছিল ‘ডার্কেনিং ডেজ অফ বেঙ্গল’। এই অ্যালবামটি গ্রন্থণা করেছিলেন ইলা সেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অ্যালবামটি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করে। বুভুক্ষু মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণা শিল্পীর তুলিতে কী হৃদয়বিদারক রূপ পরিগ্রহ করতে পারে তার জ্বলন্ত নিদর্শন ছিল জয়নুলের সেই চিত্রমালা। তার আগে এদেশের কেউ ভাবতেও পারেননি যে এইভাবে একজন শিল্পী ছবি আঁকতে পারেন।

মৃত মায়ের বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা শিশু, স্ত্রীর শবদেহের পাশে আর্তনাদরত স্বামী, ডাস্টবিনে খাবারের খোঁজে উন্মত্ত মানুষ ও কুকুর, মৃত মানুষের চোখ ঠুকরে খাচ্ছে এক দঙ্গল কাক — এইসব দুঃসহ দৃশ্যও যে ছবি হয়ে উঠতে পারে, আর তার প্রকাশভঙ্গিও যে এতটাই তীব্র হতে পারে জয়নুলের ছবির আগে তার কোনও নিদর্শন এদেশ দেখেনি। যদিও একথা উল্লেখ্য যে সেই সময় তাঁর পাশাপাশি চিত্তপ্রসাদের মতো কতিপয় শিল্পী অসাধারণ কিছু ছবি এঁকেছিলেন একই বিষয়ে। তবু জয়নুল আবেদিনের কাজ ছিল স্বভাব–স্বতন্ত্র।

তেলরঙের চ্যাপ্টা ব্রাশ শুধুমাত্র কালো কালিতে ডুবিয়ে জয়নুল যে সমস্ত রেখাচিত্রের জন্ম দিয়েছিলেন বাস্তবিকই সেগুলি ছিল অতুলনীয় এবং অবিশ্বাস্য। রেখার মধ্যে দিয়ে কান্না ও ক্রোধের এমন ধারাবাহিক প্রকাশ আজ অবধি দুর্লভ। ‘ডার্কেনিং ডেজ অফ বেঙ্গল’ অ্যালবামটির জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সরকার সেটিকে বাজেয়াপ্ত করে। সংকলনটিকে দর্শকের সামনে থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন শিল্পী ও প্রকাশক। কিন্তু ততদিনে অগুনতি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়েছে ছবিগুলি।

আজও সেই চিত্রমালা দুর্ভিক্ষের স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন হয়ে চিত্রপ্রেমীদের মনের কোনে রয়ে গেছে। একজন শিল্পীর পক্ষে এ বড় কম সম্মানের কথা নয়। আজও যখন এই দেশ কিংবা এই পৃথিবীর কোনও প্রান্তে অনাহারে মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে তখন জয়নুলের ‘ডার্কেনিং ডেজ অফ বেঙ্গল’–এর রেখাগুলি সজারুর কাঁটার মতো তীক্ষ্ম হয়ে আমাদেরকে বিদ্ধ করে। আমরা রক্তাক্ত হই, নিজেদের খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে লজ্জাবনত হতে শিখি।

 

Check Also

সপ্তম শ্রেণির ৫ম সপ্তাহের গণিত অ্যাসাইনমেন্ট উত্তর ২০২২

সপ্তম শ্রেণির ৫ম সপ্তাহের গণিত অ্যাসাইনমেন্ট উত্তর ২০২২ প্রিয় শিক্ষার্থী  আপনি যদি ৫ম সপ্তাহের সপ্তম …

Leave a Reply

Your email address will not be published.